Mafia_Boss_Sesone 2
Tabassum Riana
Part:08
রিংকি প্রচন্ড অবাক হয়েছে সেই সাথে রাগে শরীর গজ গজ ও করছে।বাহিরে ঠান্ডা লাগছে ওর অগত্যা হাতের ওপর ঝুলানো এ্যপ্রোনটা পরে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,
''ফাজলামি পেয়েছেন?এমন ভাবে বলছেন যেন আমি অপেক্ষা করতে বলেছি?
রুয়েল গাছের কাছ থেকে সরে এসে রিংকির থেকে একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো।অনেক সময় পর এমন একটা সন্ধ্যায় দেখার সুযোগ পেয়েছে রিংকিকে। বেশ বড় হয়েছে মেয়েটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।চেহারায় ও বেশ পরিপক্কতা এসেছে।চোখে সোনালী চিকন ফ্রেমের চশমা আর এলোমেলো ভাবে বাঁধা চুল।আজকাল হিজাব পরতে দেখেনা মেয়েটাকে।হিজাবে কতটা স্নিগ্ধ আর মায়াবী লাগতো মেয়েটাকে।তবে এভাবে ও খারাপ লাগছেনা।হিজাবটা যে ওর প্রেমিকা রিংকি পরতো। সেই হিজাবী রিংকিকেই ভালবেসেছিলো তবে এখনো ভালবাসাটা আছে নাকি শুকনো পাতার মতো মুড়িয়ে ফেলে দিয়েছে মেয়েটা বুঝতে পারেনা রুয়েল।কিন্তু এখনো যে হৃদয়ের এক কোনে ব্যাথা অনূভব হয় মেয়েটার জন্য সেটা কি ও বুঝবে?কিছুক্ষন চুপ দুজনে।রিংকি ফোনে কি যেন দেখছে আর রুয়েল একদৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখছে।রিংকি কি চোখ লুকাতে চাইছে নাকি সত্যি ওকে দেখতে চাইছেনা?রুয়েল নীরবতা ভেঙ্গে বলল,
''হিজাব করোনা এখন আর?"
রিংকি গরম নজরে তাকালো রুয়েলের দিকে।প্যান্টের পকেটে ফোন রেখে বলল,
''আমি হিজাব করি কি না করি সেটাতে আপনার কিছু যায় আসার কথা না।কি করতে এসেছেন এখানে?নাটক দেখতে এসেছেন?বেঁচে আছি ভালো আছি সেটাতো হাসপাতালে দেখতে পেয়েছেন।নাকি আমার সুখ সহ্য হচ্ছেনা বলেই বিরক্ত করতে এসেছেন?"
রুয়েল মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে রিংকির গাল স্পর্শ করতে আসতেই রিংকি সরে দাঁড়িয়ে বলল,
''বেয়াদবি করার কথা চিন্তা ও করবেননা।"
রুয়েল হাত সরিয়ে বলল,
''দেখতে এসেছিলাম তোমাকে।"
রিংকি রেগে বলল,
''বেশি সাহস হওয়া ভালো না।এটা অফিসার্স কোয়ার্টার।আমি আমার ম্যাডামের কোয়ার্টারে থাকি। কেউ যদি এখানে দেখে আপনাকে আমাকে বিরক্ত করতে কি হতে পারে জানেন?চলে যান এখান থেকে আর দেখতে চাইনা আপনার অভিশপ্ত মুখ।"
রুয়েল রিংকির আরেকটু কাছে এসে বলল,
''আমি তো বিরক্ত করছিনা।তোমাকে দেখে চলে যাবো।আর কেউ যদি দেখে নেয় ও আমাকে মারলে থাকতে পারবে?"
রিংকি এবার রুয়েলের বুকে সজোরে ধাক্কা দিতেই অনেকটা ছিটকে সরে গেলো রুয়েল।রিংকি কটমটে কন্ঠে বলল,
''অবশ্যই।আপনার স্মৃতিশক্তি দূর্বল হলে ও আমার স্মৃতিশতি যথেষ্ঠ প্রখর।কখনো আসবেননা আমার সামনে।এখন অসহ্য লাগে আপনাকে জাস্ট অসহ্য।"
বলেই সামনে ফিরে বাসার গেটে ঢুকার জন্য অগ্রসর হয়।রুয়েল রিংকিকে দেখছে যাবার পথে।
বুকের ভেতর হাহাকার বয়ে যাচ্ছে। চোখজোড়া শান্ত তবে অসহায়।বুকের ভেতরের তুফান কেবল অনুভব করতে পারছে কিন্তু দেখানোর মতো না।
লজ্জা হচ্ছে খুব লজ্জা!!!নওজের কর্মফল ওকে প্রতিনিয়ত লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে।তবুও মনের মাঝে একটা প্রশ্ন থেকেই গেছে।সেটা ছিলো রিংকির বলা কথা গুলো কি সত্যি?ও কি মন থেকে বলেছে?বলারই কথা অপরাধ করেছিলো ও।ঘোর অপরাধ যার কারনে আজ ভাইকে দেখার সুযোগ মেলেনি আর না মিলেছে প্রেমিকার কাছে ঠাঁই।
পৃথিবীটা হাসছে আজ রুয়েলের ওপর।সবাই ধিক্কার জানাচ্ছে ওকে।বলছে কতো বোকা ছিলিস দেখলি?এখন ভোগান্তি তোর।রুয়েল আরেকটাবার রিংকির ঘরের দিকে তাকায়।তারপর গন্তব্যহীন উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে।বারংবার পিছে ফিরে তাকায় আসলে ও কি আসবে না একবার?বলবেনা কেমন আছো তুমি?
***
এদিকে ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয় রিংকি।মা বাবা চলে যাবার পর ভাই ওকে দেখেইনা।মাসে মাসে টাকা পাঠালে ও খোঁজ নেয়না বোন কি আছে না নেই?একমাত্র রুকমা ম্যাম যিনি নিজের কোয়ার্টারে ওকে থাকতে দিয়েছেন।রিংকি অবশ্য একা থাকেনা।ওর দুজন ক্লাশ মেট মধুমিতা আর অনন্যা ও সাথে থাকে।ওরা অবশ্য পুজোর ছুটিতে গ্রামে গেছে।তাই অগত্যা রিংকিকে একা থাকতে হয়।পানির গ্লাস নিয়ে রুমে আসে রিংকি।ফোনটা হাতে ফেসবুকে ঢু মারতে মারতে একসময় চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।অশ্রু সায়রের ন্যায় গড়াতে থাকে।ও কেন বেঁচে আছে?মা বাবার সাথে ও চলে যেতে পারতো। অন্তত এগুলোর মুখোমুখি হতে হতোনা।বড্ড কষ্ট লাগছে অসহ্য লাগছে সব কিছু।এ কেমন অশান্তিতে পড়ে গেলো ও?কই যাবে? কার কাছে যাবে?কাকে বলবে আমার এই অশান্তির ঔষধ কি?ফোনে রুহীর নম্বরে ডায়াল করে রিংকি।অন্তত এই একজন মানুষ যাকে রুহী ভরসা করে ভালবাসে।
***
শান্ত দৃষ্টিতে আকাশের পানে চেয়ে রুয়েল।রিংকির বাসার পাশের খালি একটা মাঠের কোনায় শুয়ে আছে ও চোখজোড়া ভিজে একাকার।এখন ভাইয়া ওর পাশে থাকলে হয়ত এক চুটকিতেই সব ঠিক করে দিতো।কিন্তু নিজেই সব শেষ করে দিয়েছে।রিংকি ভুল বলেনি ও অভিশপ্ত শয়তান।যাকে স্বয়ং গড দেখতে পারেননা।ভীষন শীত রুয়েলের পাতলা সাদা শার্টটা কোনভাবে মানিয়ে নিচ্ছেনা।কিন্তু ওর থাকার জায়গা নেই।সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেছে শুধুমাত্র ওরই দোষে।শোয়া অবস্থায় বারবার বলতে লাগলো,
''ভাইয়া!! ভাইয়া!!! মাফ করো আমাকে মাফ করো।"
***
সাবিনা রহমান আর খালাম্মু রোয়েনের বিছানার পাশে বসে।রুহী খাটের সামনে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে লোকটাকে দেখছে।সাবিনা রহমান আর খালাম্মু আক্রমনের কথায় ভীষন ভয় পেয়েছেন।তারা চিন্তা ও করতে পারেননি এমন কিছু হবে।রুহীর সাথে কথা হবার সাথে সাথে ওনারা এক দন্ড ও টিকতে পারেননি।ফ্লাইটের টিকিট কেঁটে চলে এসেছেন।তবে রোয়েনের পা নাড়ানোয় বেশ খুশি ওনারা।সবাই আশাবাদী যে ওনি খুব জলদি ফিরবেন ওনাদের কাছে।কিছুসময় সেখানে কাঁটিয়ে দুজনে বেরিয়ে যান। খালাম্মুকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছে।আশ্চর্যজনকভাবে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছেন কেঁদে।এমনিতেই রোয়েনকে ঘিরে খালাম্মুর আচরন বেশ প্রশ্ন জেগেছিলো তবে এখন মনে হচ্ছে উত্তর গুলো জানা প্রয়োজন ওর।খুব বেশি প্রয়োজন।
ওনারা যেতেই রুহী রোয়েনের পাশে বসে ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
''কেমন লাগছে আপনার?খুব কি দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে আমায়?আমাকে আদর করতে ইচ্ছে হয়?
আমি জানি রোয়েন আপনি সব শুনতে পান আপনার ব্ল্যাক রোজকে শুনতে পাচ্ছেন।আমি খুব চিন্তিত রোয়েন।খালাম্মুকে নিয়ে।ওনি ভীষন ভালবাসেন আপনাকে।সেটা চিন্তা না রোয়েন ওনি যেদিন আপনাকে রক্ত দিলো তখন থেকে ওনার স্বার্থহীন ভালবাসা দেখি আপনার জন্য।ওনার সাথে কি আপনার আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?আপনার পরিবার সম্পর্কে সত্যি বলতে তেমন ধারনা নেই আপনার।আমি শুধু অপেক্ষায় আছি আপনার জাগার।আপনার কাছে উত্তর আছে আমার সকল প্রশ্নের।অনেক কিছু জানার আছে আপনার কাছে।এভাবে যে আর পারছিনা। মনের মাঝে অস্থিরতা কাজ করছে খুব।এই অস্থিরতা আপনিই মেটাতে পারেন।হঠাৎ রুহীকে অবাক করে রোয়েন পাশে এসে বসে।গায়ে কালো শার্ট জড়ানো।রুহীর দিকে মুখ করে আছে।ঠোঁটে পাগল করা চমৎকার হাসি।রুহীর গালে আলতো চুমু দিয়ে বলল,
''ব্ল্যাকরোজ এত চিন্তা এত অস্থির মানায় না তোমায়।ফুলের মতো রেখেছিলাম তোমায় চেয়েছিলাম আমার ঘরেড ফুল হয়ে থাকবে।তাহলে কেন তোমার কপালে চিন্তার রেখা কেন মনে এত বেদনা?তোমাকে এভাবে ভালো দেখায়না রুহী।"
রুহী রোয়েনের গাল স্পর্শ করে বলল,
''এত কথা বলেন।তাহলে ফিরে আসতে এত কেন সমস্যা আপনার?"
রুহীর কথার জবাবে হাসে রোয়েন কিছু বলেনা।হঠাৎ রুহী দেখলো মানুষটা শুয়ে।চোখের কোনায় অশ্রু জমে আছে।রুহী হাতের তালু দিয়ে পানি মুছে দিয়ে রোয়েনের ঠোঁটে লম্বা চুমু দিয়ে বলল,
''আমি আরো অপেক্ষা করবো আপনার?যতো সময় দরকার নেন আপনি।শুধু ফিরে আসেন আমার কাছে।আমার তো বৌ সাজা হলোনা রোয়েন।দেখতে চাননা আমাকে বৌ রুপে?আপনার বৌ!!!"
***
আজ সারাদিনের কথা ভেবে ভেবে অস্থির রামীন।মাথা ভার হয়ে আছে একেবারে।এদিকে জ্যাসটা কল করে করে মরে যাচ্ছে।ওর শোভন জানু কই গেলো?এখন কেন ওকে কল দেয়া হচ্ছে?বদমাশ মহিলা!!!কয়টা লাগে এর বুঝেনা রামীন। ভালোই তো জড়াজড়ি হচ্ছিলো জানোয়ারটার সাথে এখন কি হয়েছে?কথা বলবেনা রামীন কখনো বলবেনা।হঠাৎ ওর ভাবনা চিন্তাকে দমিয়ে মেসেজ এলো জেসমিনের।মেসেজটি ছিলো,মরে গেলি নাকি?কল ধরছিস না যে!!দরজা খুল কারেন্ট নেই।আমি আধঘন্টা যাবৎ দাঁড়িয়ে।"
মেসেজে চোখ বুলিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বে ও দরজার পানে এগিয়ে যায় রামীন।দরজা খুলতেই দেখতে পায় জেসমিন দাঁড়িয়ে।পরনে হলুদ জামদানী।হলুদ ব্লাউজটা ঘেমে গায়ের সাথে মিশে আছে। জেসমিন এই অবস্থায় দেখে মেজাজ তিরতির বেড়ে গেলো রামীনের।জেসমিনকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওর হাত শক্ত করে ধরে টেনে রুমে নিয়ে এসে দরজা ভীষন শব্দ করে লাগিয়ে দেয় রামীন।জেসমিন কথা বলতে এসেছিলো কিন্তু রামীনকে দেখে গলা আটকে আসছে ওর।রামীন জেসমিনের আঁচল টেনে খুলে ফেলে নিজের বুকে টেনে নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেঁপে চুমু দিতে শুরু করে।
জেসমিন এই আকস্মিক আক্রমনের জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলোনা।লোকটার শরীর থেকে সিগারেটের উঁটকো গন্ধ ভেসে আসছে।এদিকে রামীন কি করছে নিজে ও জানেনা।প্রচন্ড রাগ অভিমান চেঁপে ধরেছে ওকে।জেসমিন ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইছে রামীনকে। একপর্যায়ে রামীন ওকে পিছে ঘুরিয়ে ব্লাউজের ফিতা খুলতে থাকে।জেসমিন আর সহ্য করতে না পেরে রামীনের দিকে ফিরে জোরে চড় বসিয়ে দিয়ে শাড়ীর আঁচল গায়ে জড়িয়ে নিলো।চিৎকার করে বলল,
''পাগল হয়ে গেলি?কি করছিস এগুলো রামীন?আমি আশাই করিনি তোর থেকে এসব।আমরা এমন কোন সম্পর্কে নেই যে এসব করবো।আমি তোকে ভাল ভেবেছিলাম কিন্তু.."
জেসমিনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রামীন চিৎকার করে বলল,
''আমি খারাপ তাহলে তুই কি হ্যা?তুই কি?যখন ঐ ছেলে ছিলোনা আমার ঘরে যখন তখন চলে আসতি।আমার জন্য রান্না এমনকি কাপড় ও ধুয়ে নিজেকে বৌ বানাতি আমার।আর আজ শোভ আসতেই পল্টি নিলি?জড়াজড়ি করে ঘুরতে যাচ্ছিলি?কি ভাবলি আমি জানবো না? দেখবোনা?কত নোংরা তুই ভাবতেই গা শিরশির করছে আমার।ঐ ছেলের জন্য আমারে তুই এভয়েড করলি?খুব থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিলো একসাথে তাইনা?চরিত্রহীন কোথাকার!!!"
জেসমিন অশ্রুসজল দৃষ্টিতে রামীনকে দেখছে। এতকিছু ভেবে নিলো রামীন?কোন কথা বলার ও সুযোগ দিলো না।এত রাগ ছিলো ওর ভেতর যে...
ভাবতে পারেনা জেসমিন।রামীনের দিকে না তাকিয়ে ঘরের দরজা খুলে কেঁদে কেঁদে বেরিয়ে গেল।
চলবে
Mafia_Boss_Season 2
Tabassum Riana
Part:09
সিড়ি বেয়ে তুফানের মতো নেমে আসে জেসমিন।চোখজোড়া বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে চলেছে।এটা কি হচ্ছিলো ওর সাথে? আর কেনইবা হচ্ছিলো?এতকিছু কি ঘুনাক্ষরে ও ভেবেছিলো জেসমিন?রামীন তো এমন ছিলোনা। এত চঞ্চল হাসি খুশি মানুষটা ওকে এভাবে আঘাত করতে পারে এও কি সম্ভব?হ্যা সম্ভব হয়েছে। রামীন আঘাত করেছে ওর মনে।রাস্তা দিয়ল হেঁটে চলেছে মেয়েটা।রামীনের সাথে ধস্তাধস্তির কারনে শাড়ীটা অনেকটাই খুলে আঁচলটা বড় হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে।জেসমিনের হাত পা চলতেই চাইছেনা।খুব জোর করে টেনে টেনে হাঁটতে থাকে।ঝাপসা চোখজোড়া আরো ঝাপসা হয়ে আসছে।গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু ও পারছেনা।বারবার রামীনের বলা কথা গুলো কানে ভেসে আসছে।ওকে চরিত্রহীন বলতে কি এত টুকু ও বাঁধেনি তার?ওকে এত আপত্তিকর ভাবে স্পর্শ করতে কি হাত কাঁপেনি একবার ও?রামীন বুঝেনি কেন ওকে?কেন এভাবে আঘাত করলো?জেসমিন কি এই আচরনা পাওনা ছিলো তাহলে?কথা গুলো ভাবতে ভাবতে একলা পথে হাঁটতে থাকে জেসমিন।চোখজোড়া ভিজে একাকার।
***
এদিকে গাড়ি নিয়ে ফিরছে শোভন।আজ একটা সার্জারি থাকায় বেশ দেরি হয়ে গেছে।ফরেইন থেকে আসতেই বেশ নামকরা এক হাসপাতালে জব হয়েছে ওর।আজ প্রথম সার্জারি করেছে বাংলাদেশে এসে।রাত বারোটা বাজছে তারপর ও মুখে খাবার তুলতে পারেনি ও।কারন বাসায় কেউ অপেক্ষা করছে ওর।তাকে ছাড়া মুখে খাবার তোলাটা যে বড় অন্যায় হয়ে যাবে।কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই চোখ পড়ে রাস্তার কোন ঘেঁসে হাঁটা মানবীর দিকে। লুকিং গ্লাসে মনে হচ্ছিলো মানবীকে চিনে ও।কিন্তু পরক্ষনে মনে হলো জেসমিন কেন থাকবে?ও তো বাসায় যাবার কথা।বডি চেকআপ করে বলছিলো কি কাজে জলদি ফিরতে হবে।তাহলে এত রাতে ও বাহিরে কেন?শোভন সামনের দুটো লাইট অন করে বুঝতে পারে আসলেই জেসমিন।তাহলে মেয়েটা এখানে কেন?এভাবে কেন হাঁটছে।বড় বিদ্ধস্ত লাগছে ওকে।শোভন দুবার না ভেবেই জেসমিনের কাছে গাড়ি নিয়ে থামালো।জেসমিন হেঁটে যাচ্ছে।ওর নজর বেশ মন্থর।কোন গন্তব্য নেই যেন।শোভনের মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু হয়েছে জেসমিনের সাথে।কিন্তু কি হয়েছে?শোভন গাড়ি থেকে নেমে জেসমিনের সামনে দাঁড়িয়ে ওকে থামায়।জেসমিন নীরব দৃষ্টিতে শোভনকে দেখে চোখ সরিয়ে নেয়।কিছু বলে না ও।শোভন জেসমিনকে ভালভাবে দেখে বলল,
''জেসমিন গাড়িতে বসো বাসায় যাবে।"
জেসমিন ধীরে বলল,
''লাগবেনা কাউকে আমি যেতে পারবো।"
শোভন জেসমিনের হাত ধরে বলল,
''তোমাকে ভালো দেখাচ্ছেনা।চলো আমার সাথে।"
জেসমিন কিছু বলেনা।ও কিছু বলার অবস্থায় নেই একেবারে।শোভন অনেক জিজ্ঞেস করেছে কি হয়েছে?এত রাতে কেন বাহিরে ছিলো?কিন্তু জেসমিন কিছুই বলেনি।ঘন্টা খানিক আগে ও হাসিখুশি ছিলো মেয়েটা।মুহূর্তেই কি হয়ে গেলো তবে?শোভন জেসমিনকে নিয়ে ওর বাসায় চলে এলো।জেসমিনের বাসা চেনা নেই ওর।তাছাড়া জেসমিন থেকে শুনেছিলো ও একাই থাকে।তাই এখন ওকে একা রাখা ঠিক ও হবেনা।তাই ঘরে এসে মাকে বলে জেসমিনের শোয়ার ব্যাবস্থা করে শোভন।
***
শীতের ঠান্ডা হাওয়ায় পর্দা গুলো উন্মাদতায় বারবার উড়োউড়িতে মগ্ন হয়ে যাচ্ছে।এমনিতেই আজ কাল একটু বেশিই শীত পড়ে,অসহ্য রকমের শীত।আর শীত পছন্দ না রামীনের। জেসমিন চলে যাওয়ার পর ও ভীষন রেগে রামীন।এসেছিলো নাটক করতে?নতুন নাগরের সাথে ঘুরে এসে ওর সাথে এসেছিলো নষ্টামি করতে। ফালতু মহিলা কোথাকার।বারবার শোভনের সাথে জেসমিনের কোলাকুলি ব্যাপারটা মনে আসতেই মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছিলো রামীনের।কেন যেন সহ্যই করতে পারেনি এমন দৃশ্য।তাই তো নিজের সমস্ত রাগ ঝেঁড়ে দিলো জেসমিনের ওপর।হঠাৎ হাতের দিকে চোখ পড়তেই চমকে যায় রামীন।হাতের চামড়া চিরে রক্ত বেরুচ্ছে।কি করে কাঁটলো?তখনই মনে পড়ে চুমু দেয়ার সময় জেসমিন ওর হাত সরাবার জন্য খুব শক্ত খাঁমচি মেরে দিয়েছিলো।রামীন বুঝতে পারছে রাগের বশবর্তী হয়ে কি করে ফেলেছে ও?নিজের এত ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এভাবে কষ্ট দিয়ে ফেললো।জেসমিন হয়ত এমনটা আশা ও করেনি।আর রামীন ওর সাথে কি করতে যাচ্ছিলো।বাকি সব পুরুষদের মতো.....ছিঃ রামীন এটা কেন করতে গেলি?জেসমিন বন্ধু হয় তোর।আর তুই ওকে এভাবে হেনস্তা করলি অপমান করলি!!!রামীন কি করবে বুঝতে পারছেনা।আচ্ছা ও কি নিচে আছে?তাহলে ঘরে এনে সরি বলবে রামীন।আর এখন তো অনেক রাত।ও ঘরে একা যেতে পারবেনা।কথা গুলো ভেবেই আর একমুহূর্ত ও অপেক্ষা না করে নিচে চলে আসে রামীন।কিন্তু জেসমিন নেই।বেশ দূরে গিয়ে ও খুঁজে পায়নি জেসমিনকে।শেষে ওকে কল দিতে থাকে।কিন্তু রিসিভ হয়নি জেসমিনের ফোন।তাই ব্যার্থ নিয়ে ঘরে ফিরে আসে রামীন।ঘরে এসে ও কল করতে থাকে জেসমিনকে।একসময় সিম বন্ধ পায় জেসমিনের।সারারাত অস্থিরতায় কেঁটে যায় ওর।না জানি মেয়েটা কই গেলো?ফোনটাও অফ সেই সাথে এত শীতের রাত।কই আছে জেসমিন?মেয়েটাকে কই খুঁজবে রামীন?আর হঠাৎ ফোনটাই বা অফ হলো কি করে?
***
সকালের স্নিগ্ধ উষ্ণতা শিহরিয়ে দেয় রুহীকে।রোয়েনের বাহুডোরে থাকা কালীন চোখ ঘোরায় জানালার পানে।ভোরের মায়াময়ী আলো বেশ ভালো লাগে ওর শুধু লোকটার সাথে।রোয়েনের দিকে চোখ ফিরিয়ে ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়ে নেয়।তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে আসে।আজ ওনার স্কুলের একটা ছোট্ট ভাষন দিতে হবে তবে সেটা এখান থেকেই দিবে রুহী।গোসল সেড়ে নিয়ে রুমে চলে এলো।তারপর প্রস্তুত হয়ে নেয় অফিস যাবার জন্য।যাবার আগে আরেকটা বার মানুষটাকে ভালবেসে বেরিয়ে যায় রুহী।অফিসে এসে স্ক্রিপ্ট রেডি করছিলো কি বলবে ভাষনে।রোয়েনের একটা রেকর্ডিং শুনছে যেটা ও কোন একটা প্রজেক্টে ব্যাবহার করেছিলো।সম্ভবত হাসপাতালের জন্য।
রামীন ভাই ও আসলোনা এখনো।তবে এতে সমস্যা হচ্ছেনা রুহীর।শুধু সাপোর্ট পায় অনেক বেশি সাপোর্ট। মনে হয় ওর বড় ভাই সাথে আছে।কয়েকবার রামীনের নম্বর ডায়াল করে ও।ফোন ধরছেনা কেউ।অগত্যা ফোনটাকে পাশে রেখে স্ক্রিপ্ট মনে করতে থাকে।স্ক্রিপ্ট লেখার উদ্দেশ্য মেইন পয়েন্ট গুলো মনে রাখা।প্রায় একঘন্টা পর রামীন চলে আসে। চোখজোড়া ফুলে আছে একেবারে।অন্যসময় আসলে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসে মানুষটা।তাহলে কি হলো আজ?এত চুপচাপ কেন ওনি?রুহী আড় চোখে রামীনকে দেখে নিয়ে কাজে মন দেয়।পাঁচমিনিট পরই ভিডিও কলে যাবে রোয়েনের স্কুলের হেডমাস্টার রাশেদ মামুনে স্কাইপিতে।রামীন অবশ্য আলস্য ভাবে বসে ও ছিলোনা ভাষনের সময়।এটা ওটা রেডি করে দিচ্ছিলো রুহীকে।রুহীর কথা গুলো শুনতে ভাল লাগছে রামীনের।মোটিভেট করবে যে কাউকে কথা গুলো।স্পীচের সময় রুহীর চেহারায় যে গাম্ভীর্য পূর্ন ভাব ফুঁটে উঠে সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়।রোয়েন নিশ্চয়ই পছন্দ করবে রুহীর এই দিক।স্পীচ শেষ করে রামীনের দিকে তাকায় রুহী।রামীন ভাইকে ভীষন বিপর্যস্ত লাগছে।কি হয়েছে ওনার?এমনটা তো কখনো দেখা যায়নি ওনাকে। সেদিন কাজ শেষ করতে করতে বিকেল হয়ে আসে।আজ ও লোকটার রুম পরিস্কার করেছে রুহী তারপর বেরিয়ে আসে।সুমনা আর নার্সকে দেখতে যাবে।রামীন ও যাচ্ছে রুহীর সাথে।রুহী বলল,
''ভাইয়া আপনি ঠিক আছেন?"
রামীন একটু হেসে বলল,
''হ্যা রুহী।কেন বলো তো?"
রুহী মাথা নেড়ে বলল,
''এমনিই।আজ এত চুপচাপ তাই বললাম।"
রামীন একটু হেসে ফোনে মন দিয়েছে।সুমনা রুহীকে দেখে খুব খুশি।মা ওদের জন্য পায়েশ রেঁধে পাঠিয়েছে।রুহী সুমনাকে খাইয়ে দেয়।নার্সের বর এসেছে।ওনি তাকে খাইয়েছে পায়েশ নিয়ে।আরো দুদিন থাকার পর ওদের রিলিজ দেয়া হবে।ঘা তেমন গভীর ছিলোনা কারোরই।ওদের থেকে বিদায় নিয়ে রামীন ভাইকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরে রুহী।রাত দশটা বেজে গেছে। কোনমতে খেয়ে নিয়ে রোয়েনের ব্যায়াম করাতে থাকে রুহী।তারপর রোয়েন হাত পা শরীর মুছিয়ে দিয়ে ওকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ে।আজ মহাশ্বেতা দেবীর ''হাজার চুরাশির মা "উপন্যাসটি পড়ছে রুহী।ঘুম আসছেনা একদমই।তাছাড়া শীত ও বেশ পড়েছে।কম্বল দিয়ে মানুষটাকে ভালো মতো জড়িয়ে দিয়েছে ও।কোনভাবেই কষ্ট না পায় যেন সে।রাত গভীর হচ্ছে সেই সাথে চোখজোড়া ভার হয়ে আসতে থাকে রুহীর।এক পর্যায়ে বই রেখে রোয়েনের বুকে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে যায় রুহী।হঠাৎ কিছু একটার স্পর্শ পেয়ে চোখ তুলে তাকায়।
চলবে.....?

0 মন্তব্যসমূহ