উপর তলা থেকে চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ আসছে… সাথে শোনা যাচ্ছে - আম্মা আর করবো না।

বিষয়টা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একটু আগেই তো তাদের বাসায় আমাদের দাওয়াত ছিলো। তার ছেলে চাকরি পেয়েছে নতুন সেজন্য। কত অমায়িক পরিবার। কি রেখে কি খেতে দিবে কিভাবে খাতির যত্ন করবে সে নিয়ে তাদের কত হৈ হুল্লোড়। তাহলে এই অল্প সময়ের মধ্যে কি হলো?

যেহেতু সে আমার ভাড়াটিয়া তাই সাহস করে যেতেও পারছি না। অনাধিকার চর্চা হয়ে যায় কিনা সে ভয়ে।

স্ত্রীকে ডেকে বললাম - কে কাঁদছে এভাবে? জানো কিছু?

সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল - আর কে? তুমি যেই খালাম্মার একটু আগে প্রশংসা করলা - কত্ত ভালো মানুষ সে তার ছেলের বৌ এর সাথে চিল্লাচ্ছে।

আমি কিছুটা স্তব্ধ হয়ে বললাম - কেনো উনাকে দেখে তো এমন লাগলো না।

আমার স্ত্রী বলল - থাক তোমার সাথে তর্কে যাবোনা। মহিলা মানুষের বিষয়। তুমি বুঝবে না।


এই বলে সে চলে গেলো। আমি টিভি দেখতে লাগলাম। হঠাত মনে হলো উপর তলায় ঠাস করে কিছু পরে ভাঙ্গলো আর এরপর আরো জোরে চিৎকার। 

আর নিতে পারছিলাম না। বাড়িওয়ালা হিসেবে এবার ওদের বাসায় যাওয়ার কথা ভাবলাম। 

চশমাটা চোখ থেকে খুলে হাটা দিলাম উপর তলায়।

কলিং বেল দিতেই সব চুপচাপ হয়ে গেলো।

১-২ মিনিট পর অর্ধেক দরজা খুলে মুখ বের করলেন খালাম্মা।

হাসি মুখে এগিয়ে বললেন - কি হইসে বাবাজি?

আমি বললাম - একটু আগে কান্নার আওয়াজ পেলাম। তারপর মনে হলো কি যেন ভেঙ্গে গিয়েছে। কি হয়েছে? কোন সমস্যা?

খালাম্মা বললেন - আরে না বাবাজি। বৌমা কাজ করতে গিয়ে হাত লেগে টেবিলের কাঁচ টা ভেঙ্গে গেছে। নিজে থেকেই ভয়ে কান্না করছে। ভয় পাইসে আমি যদি কিছু বলি সেজন্য।

আমার কাছে কেন যেন তেমন কিছু মনে হলো না।

পুরুষ মানুষ তাই জোর করে ঢুকতেও পারলাম না। চলে আসলাম সেখান থেকে।

কিন্তু আসার পর থেকে মাথা ধরে আছে। তাই সহ্য না করতে পেরে আমার স্ত্রীকে ডেকে বললাম - চলো তো আমার সাথে।

সে বলল - কোথায়?

আমি হাত ধরে টান দিয়ে তাকে নিয়ে গেলাম উপর তলায়। 

আবার কলিং বেল দিলাম। এবার আরো সময় নিয়ে দরজা খুলল তারা। এবার দরজা খুলল খালাম্মার ছেলে। একদম ঘামিয়ে আছে সে। বয়সে আমার সমবয়সী হলেও বিয়ে করেছে আমার মেয়ের বয়সী একটা মেয়েকে।

সে জিজ্ঞাসা করলো - কিছু বলবেন ভাই?

বললাম - তোমার আম্মার সাথে কথা আছে। ভেতরে যাবো।

সে বলল - আম্মা নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে বলতেসি যেন আপনার সাথে দেখা করে আসে।

আমি খানিকটা ধাক্কা দিয়েই বললাম - এখনই দেখা করবো।

এই বলে ঘরে ঢুকে আমার মাথা ঘুরে গেলো। ফ্লোরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। সামনের ঘরের টি টেবিলটার গ্লাস ভেঙ্গে নিচে পরে আছে।ঘরের ভেতরটা নিশ্চুপ।

আমাদের বাধা দেওয়ার পরও ভেতরে গিয়ে পুরুষ মানুষ হয়েও চোখে পানি চলে আসলো। ময়না (ছেলের বৌ) মেঝেতে পরে আছে। নাক মুখ দিয়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

আমার স্ত্রী দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরলো। খালাম্মা আরেক রুম থেকে দৌড়ে এসে বলল - একটু আগে বাথরুমে পইরা ব্যাথা পাইসে। আমি এখন ডাক্তারের কাছে নিতাম।

আমি বললাম - বাথরুমে পরে গিয়েছে তো মুখে গামছা বাঁধা কেন?

ওরা একটু নড়ে উঠলো। খালাম্মার স্বামী আমাকে এসে বলল - বাবাজি বসেন। সব খুলে বলতেসি।

আমার স্ত্রী তখন বলল - ময়নার জ্ঞান নাই। ডাক্তারের কাছে এখনই নিতে হবে।

আমি খালাম্মা কে বললাম - আপনাদের সাথে আমি পরে কথা বলবো।

এই বলে একটু সাইডে গিয়ে হাসপাতালে ফোন করলাম। আর ফোন করলাম আমাদের দারোয়ানকে। মেইন গেইট টা বন্ধ করতে বললাম।

আর সবশেষে ফোন দিলাম আমাদের এলাকার থানায়।

তারা জানত না থানায় যে ফোন করেছি। একেক জন অস্থির হয়ে উঠলো। হঠাত ময়না ময়না বলে কেঁদে উঠলো খালাম্মা। শ্বশুড় সাহেবও কম না। সেও অভিনয় করে চোখ মোছা শুরু করলো।

শুধুমাত্র একজন অভিনয় করছিলো না। সে হলো ময়নার স্বামী। সে যেন ফোস ফোস করে উঠছিলো রেগে। আর বারবার বলসিলো - আমাদের ব্যাক্তিগত ব্যাপারে আপনি নাক গলাচ্ছেন কেন?

আমি কোন উত্তর দিলাম না। শুধু দেখে যাচ্ছিলাম সবাইকে।

ময়নাকে আমার স্ত্রীকে আর মেয়েকে সহ এম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল পাঠিয়ে দিলাম। সাথে যাওয়ার জন্য তার বাসার সবাই খুব জোর করলেও আমি সবাইকে নিষেধ করে দেই। আর অন্য ৩ ফ্লাটের ভাড়াটিয়া ঘরের পুরুষদের ফোন করে আসতে বলি।

তাদের আটকাই। থানা থেকে লোক আসলে তাদের হাতে এই ভদ্র পরিবারকে তুলে দেই।

এরপর হাসপাতালে গিয়ে দেখি ময়নার চিকিৎসা চলছে।

২ দিন পর পুলিশ তার স্টেটমেন্ট নিতে আসে। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। যে কারণে সেদিন ময়না নির্যাতন হয়েছিলো তা শুনে কোন কাফেরও একবার চোখের পানি ফেলত বোধহয়।

বিয়ের শুরু থেকেই কাজের মেয়ের মত তার সাথে আচরণ করা হত। কারণ সে গরীব ঘরের মেয়ে। নাহলে ওতটুক মেয়েকে এই বয়স্ক লোকের সাথে কোন বাবা মা ই বা দেয়। খাবারের কষ্ট দেওয়া হত। আর এটা প্রথমবার তার গায়ে হাত তোলা হয়নি। তাই আমরা সেদিন যখন তাদের বাসায় দাওয়াতে গিয়েছিলাম। সেদিন সে লুকিয়ে ওড়নায় কিছু পোলাউ তার ওরনায় বেঁধে বাথরুমে নিয়ে খাচ্ছিলো। কিন্তু ধরা পরে যায়। এরপর তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয় খাবার চুরি করে খাওয়ার দায়ে। একদম ৩ জন মিলে যে যেভাবে পেরেছে মেরেছে মেয়েটাকে।

আল্লাহ মাফ করুক। কত খাবার প্লেটে ফেলে উঠি আমরা প্রায়ই। আর এই খাবারের জন্য কেউ মার খেলো? কেনো খেলো?

এগুলা বলার সময় আমার স্ত্রীও পাশে ছিলো। চোখ মুছে আমার দিকে এগিয়ে বলছে - মেয়ে বিয়ে দিবোনা আমরা। দরকার নাই। মেয়ের খাওয়ার জন্য কত চিন্তা করি আর সেই মেয়ে যদি অন্যের ঘরে গিয়ে ভাতের বদলে মার খায় তাহলে তেমন বিয়ের দরকার নেই।


আমিও তাকে জড়িয়ে বললাম - সবাই এক না। সবাই খারাপ না। সবাইকে আবার দেখতে মানুষ লাগলেও আসলে তারা মানুষ না।

আমি নিজে ময়নাকে সুস্থ হওয়ার পর উকিল ধরিয়ে মামলা করাই। ময়না তার বাবার বাড়ি ফেরত যেতে চায়নি। তাই তার বাবার অনুমতি নিয়ে আমার বাসাতেই রেখে দেই। আমার একটা মেয়ে। তার সাথেই ময়না থাকে। এতে আমার স্ত্রীও কোনদিন একটা কথা বলেনি।

শত হলেও একজন মেয়ের বাবা আমি। 

আর এভাবেই যদি সবাই রুখে দাড়াতো তাহলে এই সমাজে এমন নির্যাতনকারী আর সাহস করে কাউকে নির্যাতন করতো না।

"Domestic Violence" কে না বলুন। আশে পাশে কাউকে এমন হতে দেখলে তার বিরুদ্ধে যা করার দরকার সব করুন। এতে কারো জান বেঁচে যাবে।


( গত সপ্তাহে ৩ টি মেয়ের বাবার সাক্ষাতকার নেওয়া হয়। এর মধ্যে একজনের ঘটনা আজ লিখলাম। বাকী দুইজনের টা সময় করে লিখে ফেলবো।) 


©জাকিয়া হোসেইন তৃষা