সায়েম দরজা খুলে কিছু বলা বা করার অবকাশ পেলো না। তার আগেই প্রচন্ড কোনো ঝড়ের গতিতে তার বুকের ওপরে আছড়ে পড়লো নাজ। টাল হারিয়ে দুয়েক পা পিছিয়ে গেল সায়েম। শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটা মুখ লুকিয়ে রেখেছে তার উন্মুক্ত বুকে। 


শিহরণের হওয়ায় গা ভাসালো সায়েম। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে একটা মেয়ে যদি নিজ থেকে কোনো পুরুষের বুকের ওপরে এসে পড়ে, সেই পুরুষের পক্ষে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। সায়েমের মনটাও আজ মানতে চাইছে না নিজের কোনো বাঁধাই। ইচ্ছা তো করছে মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে পিষে ফেলতে। চেনা মানুষটাকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। 


মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো সায়েম। কারণ একটাই, নাজ কাঁদছে। থরথর করে কাঁপছে তার হাত-পা। পায়ের কম্পনে দাঁড়িয়ে থাকাও দুঃসহ হয়ে উঠেছে নাজের পক্ষে। 


সায়েম আলতো করে তাকে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “কী হয়েছে নাজ?”


নাজ কিছুই বলতে পারলো না। ভয়ে জমে গেছে রীতিমত। 


সায়েম আবারও একরাশ উদ্বেগ নিয়ে বলল, “আমাকে বলো নাজ! কী হয়েছে?”


কান্নারত নাজ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আমি অন্ধকার ভয় পাই।”


সায়েম হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝতে পারলো না। হাজারতম বার আজ উপলব্ধি হলো, নিতান্তই বাচ্চা একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে সে। 


সায়েম তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “আচ্ছা, ছাড়ো আমাকে। আমি মোম জ্বালিয়ে আনছি।”


নাজ ভয়ে আরও শক্ত করে তাকে আকড়ে ধরে বলল, “না প্লিজ! আপনি কোথাও যাবেন না।”


সায়েম আর কিছুই বলতে পারলো না। থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। এবার সায়েমের মনে হলো, সমস্যা নির্ঘাত গুরুতর। সামান্য ভয় হলে এতটা অস্থির হয়ে উঠতো না নাজ। সায়েম আবারও আলতভাবে তাকে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। নাজ অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে। বুকের ওপরে মেয়েটার চোখের জলের অসিস্ত্ব বেশ টের পাচ্ছে সায়েম। 


মিনিট কয়েকের মাঝেই ইলেক্ট্রিসিটি এসে পড়লো। মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরতে শুরু করলো। নাজ এখনো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে সায়েমকে। কান্না তার থেমে গেছে। তবে ভয়টা বোধ হয় কাটেনি এখনো। 


সায়েম তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “নাজ? ইলেক্ট্রিসিটি চলে এসেছে। লাইটটা অন করি?”


নাজ ধীরস্থিরভাবে ছাড়লো তাকে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যেন ছাড়ার ইচ্ছা তার বিন্দুমাত্র ছিল না। ওভাবেই সায়েমের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারলে ভালো হতো। 


লাইট অন করতেই নাজের ভয়ার্ত মুখটা দেখে চমকে উঠলো সায়েম। রক্তশূন্য হয়ে উঠেছে মেয়েটার চোখমুখ। বিচিত্র ভয় আঁকড়ে ধরেছে তাকে। ভয়ে শ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিল বোধ হয়। এখন নিঃশ্বাস নিচ্ছে টেনে টেনে। 


নাজ নিজেই কম্পিত পায়ে বসলো বিছানার এক পাশে। সায়েম তার পাশে বসে বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। এক চুমুকে গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়ে শেষ করলো নাজ। 


সায়েম চিন্তিত গলায় বলল, “কী হয়ে গেল এটা?”


নাজ কম্পিত স্বরে বলল, “আমি অন্ধকারে ভয় পাই। প্রচন্ড ভয় পাই। অন্ধকারে থাকলে আমার হাত-পা জমে যায়। মনে হয় যেন অন্ধকারটা আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে।”


সায়েম লক্ষ্য করলো অন্ধকারের কথা বর্ণনা করার সময়েও একবার শিউরে উঠলো নাজ। 


সায়েম চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, “কবে থেকে এই সমস্যা?”


নাজ লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল, “ছোটবেলা থেকেই।”


“ডক্টর দেখাওনি কখনো?”


নাজ অসহায় ভঙ্গিতে বলল, “আমার দূরসম্পর্কের এক মামা সিক্রিয়াটিস্ট। যে বলেছিল এটা না-কি একটা রোগ। কী যেন নাম বলেছিল। নি...নিক...”


রোগের নামটা নাজ মনে করতে না পারায় নিজেই মনে করিয়ে দিলো সায়েম, “নিকটোফোবিয়া।”


“হ্যাঁ! নিকটোফোবিয়া। মামা আমাকে চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার জন্যেও বলেছিল।”


“যাওনি?”


“না। বাবা বলেছিল, এটা কোনো রোগ না। আমার বাচ্চামি। ধীরে ধীরে সেরে যাবে।”


মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সায়েম। এই এক সমস্যা এদেশের বেশির ভাগ পরিবারের। সামান্য জ্বর-কাশিতে ডক্টরের কাছে ছুটে যেতে কোনো আপত্তি নেই তাদের। তবে মনের জটিল সব রোগগুলোর বেলাতেই যত অবহেলা। 


সায়েম নরম স্বরে বলল, “আমাকে আগে বলোনি কেন নাজ? আইপিএসটা সেই কবে থেকে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বললেই তো ঠিক করিয়ে রাখতাম।”


নাজ হঠাৎ কেঁদে ফেলে বলল, “মাথায় ছিল না ব্যাপারটা। জানেন, আমি সবসময় লাইট জ্বালিয়ে ঘুমাই। আজ তো ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। গরমে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় যখন দেখি চারিদিকে অন্ধকার, আমার মনে হচ্ছিল মরে যাবো।”


বুকের মাঝে ছোটখাটো ধাক্কা খেল সায়েম। মেয়েটার মুখে এমন কথা একেবারেই সহ্য হলো না তার। 


সায়েম আদুরে গলায় বলল, “এসব কী ধরনের কথা নাজ? এসো আমার কাছে!”


আবারও সায়েমকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে রাখলো নাজ। সায়েম এবার পরম মমতায় আগলে রেখেছে তাকে। এতক্ষণে নাজের খেয়াল হলো, একটু আগে কী করেছে সে! অন্ধকার ঘরে লজ্জার মাথা খেয়ে জড়িয়ে ধরেছে সায়েমকে। ছেলেটা তখনও তো জানে না, অন্ধকারে ভয় পেয়ে নাজ ছুটে এসেছে তার কাছে। না জানি, কী ভেবেছে মনে মনে! 


লজ্জায় লাল হয়ে গেল তার মুখটা। আরেকদফা লজ্জারা এসে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরলো তাকে, যখন টের পেলো এই মুহূর্তে কী করছে! সায়েমের উন্মুক্ত বুকটার মাঝে মুখ লুকিয়ে রেখেছে। তার ঠোঁট স্পর্শ করছে সায়েমের উষ্ণ বুকটা। 


লজ্জায় জড়সড় হয়ে রইলো, তবুও ছাড়লো না সায়েমকে। আচ্ছা, তাদের মাঝে তো কোনো ভালোবাসা নেই। মানে সায়েমের তরফ থেকে নেই। নাজ একাই ভালোবেসে আসছে তাকে সেই শুরু থেকে। ভালোবাসা না থাকলে সায়েম আবারও তাকে কেন টেনে নিলো বুকে? তার মানে কি সায়েমও ঠিক তার মতো করেই ভালোবাসে তাকে? 


আর কিছুই ভাবতে পারলো না নাজ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কেমন দিশেহারা লাগছে নিজেকে। নাজ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই ছেড়ে দিলো তাকে সায়েম। 


ভরসামাখা গলায় বলল, “এখানে ঘুমাবে আজ রাতে?”


আরেকদফা লজ্জারা কাবু করলো নাজকে। কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো। সত্যিই আজ একা একা ঘুমই আসবে না তার। সায়েমের পাশেও যে ঘুম খুব আসবে এমনটা নয়। লজ্জায় তার পাশেও ঘুম আসবে না। অদ্ভুত যন্ত্রণায় পড়া গেল তো!


নাজ লজ্জার মাথা খেয়ে ঘাড় কাত করে সায় জানালো। 


সায়েম বলল, “আচ্ছা। যাও বালিশ নিয়ে এসো।”


নাজ উঠতেই যাচ্ছিল বিছানা ছেড়ে। সায়েম হঠাৎ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “না দাঁড়াও! আমিই নিয়ে আসছি।”


সায়েম নিজে গিয়ে নাজের বালিশ নিয়ে এলো। নাজ শুয়ে পড়তেই যত্ন নিয়ে তার কাঁধ পর্যন্ত চাদর টেনে দিলো। লজ্জায়-ভালো লাগায় পাগল হয়ে নাজ কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো, তার নিজেও জানা নেই। 


ই-বুক : #অসম্ভবের_অপেক্ষায় 


সম্পূর্ণ ই-বুকটি পড়তে ক্লিক করুন কমেন্টে দেওয়া লিংকে ❤️


আমাদের নতুন পেজ টা নিল লেখায় চাপ দিয়ে ফলো করুন 👉👉 Kabbo