আমার এক আন্টি বয়সে আমার চেয়ে বড় জোর ৪-৫ বছরের বড় হবে। বলতে গেলে ছোটবেলায় একসাথে খেলাধুলা করেছি । সে বর্তমানে একটা মোটামুটি ভালো মানের জব করছে, শহরে নিজস্ব কোন বাড়ি নেই, ভাড়া বাড়িতে থাকে, দুটো পুতুলের মতো যমজ মেয়ে। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু হঠাৎ করে আঙ্কেল  কোন একটা কারণে চাকরি হারালো। এই বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম তার উপর আবার দুটো বাচ্চার স্কুল এর মধ্যে আবার ভাড়ার বাড়ি সবমিলিয়ে আন্টি কুলিয়ে উঠতে পারছিল না আর যেহেতু ছোট থেকেই ওর সাথে আমার হৃদ্যতা পূর্ণ সম্পর্ক  তাই তাকে প্রতিমাসে যথাসাধ্য সাহায্য করতাম। ওর বাড়িওয়ালা খুবই কঠোর প্রকৃতির মানুষ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভাড়া না দিলে দুই কথা শোনাতে লোকটা এক পা পিছপা হয় না।তাই আমি চেষ্টা করতাম মাসের প্রথমেই আমার খালাতো দুই বোনের অজুহাতে ওর হাতে একটা নির্দিষ্ট একটা একাউন্ট তুলে দেওয়ার, বিষয়টা এমন ভাবে আমি উপস্থাপন করতাম যেন এটাকে সে সাহায্য মনে না করে তাহলে হয়তো  মাইন্ড করতে পারে। গোলযোগটা তখন বাঁধলো যখন গত মাসে একটা কাজে আমাকে ঢাকা যেতে হয়েছিল এবং বারো দিন ওখানে থাকতে হয়েছিল। ফোনের রিং এর শব্দে হাত বাড়িয়ে আন্টির নাম্বারটা দেখে যখন ফোনটা রিসিভ করলাম , সে কেমন আছি কোথায় আছি কি করছি কিছুই জিজ্ঞেস না করে জাস্ট সরাসরি আমাকে বললো, এতটা ইরেস্পন্সিবল হলে হয় না আজকে মাসের ৫ তারিখ সে তার টাকা পায়নি তারপর বিকাশ নাম্বারটা দিয়ে লাইনটা কেটে দিলো।

না আমি ওকে টাকা পাঠাইনি, আর কোনদিন পাঠাবোও না কারণ আমার সাহায্যকে, আমার উপহার কে সে তার পাওনা হিসেবে ধরে নিয়েছে যেন আমি ওর কাছ থেকে লোন নিয়েছি এখন সেটা পূরণ করতে আমি বাধ্য।


বাস স্টপ থেকে আমার চেম্বার খুব কাছেই হাঁটা পথ তবুও ভীড় ঠেলে হাঁটতে ইচ্ছা করে না। প্রতিদিনই একজন বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালা আমাকে নিয়ে যায় । ভাড়া ১০ টাকা তবুও আমি ওনাকে ২০ টাকা দেই। একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ রিক্সা চালাচ্ছে দেখেই খারাপ লাগে ।সেদিন ২০ টাকার কোন নোট আমার কাছে ছিল না। ন্যায্য ভাড়া ১০ টাকাই দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিবাদ আর দশ টাকা কোথায় ? আমি তাকে দাঁড়াতে বললাম, ভেতরে ঢুকে গেলাম এবং আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটির হাত দিয়ে আরও দশ টাকা পাঠিয়ে দিলাম সাথে এও বলতে বললাম আগামীকাল থেকে যেন আমার জন্য সে অপেক্ষা না করে । তাকে আমার আর প্রয়োজন নেই ওখানে মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ টা রিক্সা এমনিতেই দাঁড়িয়ে থাকে।


হসপিটালের এক সিনিয়র আপু খুব অনুনয় বিনয় করে বললেন, এই মাস থেকে রোস্টারে উনাকে সপ্তাহে একটা করে নাইট ডিউটি দেয়া হয়েছে কিন্তু উনার হাজবেন্ড নাইট ডিউটি অ্যালাউ করে না । তো প্রথম সপ্তাহটা যদি আমি সাহায্য করে দেই তাহলে উনি কৃতজ্ঞ থাকবেন।  আমি রাজি হলাম প্রথম সপ্তাহ করলাম, দ্বিতীয় সপ্তাহ করলাম এবং তৃতীয় সপ্তাহেও করলাম কিন্তু গোলযোগ চতুর্থ সপ্তাহে গিয়ে। আমি আপুকে ফোন দিয়ে বললাম আমার এক ভাইয়ের বিয়ে অতএব আমি ডিউটি করতে পারবোনা। সেই আপু ফোনে আমাকে যাচ্ছে তাই বলে ফোনটা রেখে দিলেন । উনার ভাষা ছিল এরকম আজকালকার জুনিয়ররা বড়দেরকে সম্মান দিতে জানে না। প্রত্যেকটা জুনিয়র হচ্ছে বেয়াদব, এক একটা বদের হাড্ডি। আমি খানিকক্ষণ থ মেরে রইলাম তারপর উনার কেটে দেওয়া নাম্বারটা দেখে মনের মধ্যে জেদ চাপলো, একেবারে ব্লক করে দিলাম।

হ্যাঁ ব্লক করে দিলাম, আমার মনে হয়েছে এ ধরনের মানুষকে জীবন থেকেই ব্লক করে দেওয়াই উচিত।  যারা সাহায্যকে, উপহারকে অধিকার কিংবা দাবি হিসেবে মনে করে। আর সবচেয়ে তেতো সত্য হচ্ছে এই ধরনের মানুষের সংখ্যাই আমাদের আশেপাশে সবচেয়ে বেশি।