মনোহরনী 

#সারপ্রাইজ_পর্ব

আনিকা_আয়াত 

_____

শহরজুড়ে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে চারপাশ শান্ত পরিবেশ। গাছের ডাল পাতা বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার। ব্যালকনির সকল ভেজা ফুলগুলোকে দেখতে একদম সদ্য গোসল করা নববধূর মতো লাগছে। তুশি বিকেলের স্নিগ্ধ আবহাওয়ায় গা ভেজাতে ব্যস্ত। আজ সকাল থেকেই অসীম ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো তুমুল বাতাসে গাছের ডাল পালা ভেঙে যাওয়ার মতো বৃষ্টির দাপটে মন হয়ে যায় অস্থির। ইচ্ছে করে সব ছেড়ে ছুঁড়ে ঘন বর্ষায় ঘা ভেজাতে। মুক্ত পাখির মতো এখানে ওখানে ছুটে বেড়াতে। তুশি চোখ বন্ধ করে মেঝেতে বসে বৃষ্টিতে পা ভেজালো। কখনো পায়ের নুপুরে ঝুনঝুন শব্দ তুলছে নয়তো বাহারি ফুলের  টব থেকে লাল টকটকে গোলাপ নিজের মুঠোয় নিয়ে, ভেজা চুলের মাঝে গুঁজে রাখছে। দুপুরে সবাই খেয়ে দেয়ে  এই আরামদায়ক উষ্ণময় পরিবেশে জম্পেশ ঘুম দিয়েছিলো। তুষারও তাকে জরিয়ে ধরে বুকে নিয়ে ঘুমালেও ৩০-৪০ মিনিটের বেশি বিছানায় টিকতে পারেনি তুশি। মন সকাল থেকেই বৃষ্টিতে ভেজার জন্য আনচান আনচান করছে। অনেক বার তুষারের সামনে ঘ্যান ঘ্যান করলেও কোনো কাজ হয়নি।

উল্টো তুষারের রাগান্বিত হয়ে দিয়েছে এক রাম ধমক , 


" বৃষ্টিতে ভিজার খুব শখ হয়েছে? যা ভিজ। কিন্তু রাতে জ্বর আসলে আমার সাথে ঘুমাতে আসিস। লা*ত্থি মে*রে ফেলে দিবো বিছানা থেকে।"


তুশির তখন ইচ্ছে করতো লাঠি দিয়ে ওর মাথা  ফাটিয়ে দিতে। সবসময় সুযোগ খোঁজার বাহানায় ছিলো, কখন তুষার বের হবে আর সেই ফাঁকে টুপ করে বৃষ্টি বিলাস করবে তুশি। শেষে বিকেলে তুষারের দু'হাতে  মাঝ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ঠোঁট টিপে হেঁসে ভেজার জন্য দিলো এক দৌড়। ব্যালকনির চারপাশে হাত পা নাঁচিয়ে প্রায় ২৫ মিনিট ধরে ভিজছে। কখনো এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে চারপাশ দেখছে আবার কখনো বিষন্নতায় ছেয়ে মন খারাপ গুলো অকারণেই ঘিরে ধরছে। আজ তাদের বিয়ের ১৬ দিন। বাবার বাড়ি সেই যে তার পরের দিনই এসেছে, আর যাওয়া হয়নি। তাদের সাথে একত্রেই তানহা, জান্নাতও চলে গেছে নিজেদের শ্বশুর বাড়ি। রাজন ৪-৫ দিন থেকে চট্রগ্রাম কাজে জয়েন করেছে। রিমির সাথে তার সম্পর্কটা কোনোমতেই স্বাভাবিক হচ্ছে না। আদর করেও রাজন তার মন গলাতে ব্যর্থ। রিমির এক কথা, একজনকে মন দিয়ে বসেছে। সেখান থেকে কোনোদিন সরে আসতে পারবে না। বিয়ে নিজের বিরুদ্ধে হলেও সংসার কখনো মনের বিরুদ্ধে করা যায় না। শেষে রাজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে নিজের মতো রেখেই চলে যায় চট্টগ্রাম। দুইদিন আগে  বাবার বাড়ি  যাওয়ার কথা তুশি মুখ থেকে বের করতেই তুষার রাগে কটমট করে তাকায়। 


" আমি যতদিন বাসায় থাকছি ততদিন ম*রে গেলেও বাপের বাড়ির নাম মুখে আনবি না। নয়তো কুঁচি কুঁচি করে কে*টে ফেলবো।"


তুশি মন খারাপ করে টিভির সামনে বসে থাকে। মায়ের জন্য মনটা বড্ড পুড়ছে। কবে যাবে বাবার বাসায়? কবেই বা সবাইকে প্রাণ ভরে দেখতে পারবে? রাগে দুঃখে সারাদিন না খেয়েই বসে ছিলো তুশি। শেষে তুষার রাত ১১ টায় বাসায় এসে দেখতে পায়, আগের মতোই স্থির হয়ে সোফায় বসে আছে। নূরজাহানও ধমকা ধমকি করেও এক চুল পরিমান সরাতে পারেনি। তুষারকে সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তুশি মুখ মুচড়ে অন্যদিক ঘুরে বসে। অধর বাঁকিয়ে তুষার তড়িৎ গতিতে কোলের তুলে নেয়। তুশিকে কোনো কথা বলতে না দিয়েই বিছানায় ধপ করে ফেলে দরজা নক করে। তুশির খুব নিকটে এসে নরম স্বরে বলে, 


" খুব মন খারাপ? বাবা-মায়ের জন্য বুকের ভিতর পুড়ে ছাই হয়ে যায় অথচ আমার মতো নাদান ছেলের যে বউ ছাড়া একরাতও ঘুম হয় না তার বেলা? বউয়ের আদর ছাড়া লবন ছাড়া তরকারির মতো বিদঘুটে লাগে। বউকে চু'মু না খেলে তিন বেলা ভাতেও এনার্জি পাই না। এবার বুঝ, দেশের সুনাগরিক হয়ে, আমার মতো জনগণের কষ্ট তুই কি অনুভব করিস না? কিভাবে পারবি এভাবে কষ্টে রেখে বাপের বাড়ি যেতে? চুমু কম হয়েছে? তবে বল, আজ থেকে আরোও বেড়ে যাবে। এতে সংসারও হবে ঝামেলা মুক্ত। "


এসব কথায় তুশির কান ঝা ঝা করে উঠে। এই কয়েকদিনে এমন কোনো সময় নেই, যে বেহায়া কথা বলে লজ্জায় মা*রেনি  তুশিকে। এবারও লজ্জা পেয়ে নাক তরতর করে কাঁপছে তার। পাশ থেকে বালিশ তুষারের দিক ছুড়ে জবাব দেয়, 


" তুই থাক বউ নিয়ে। আমি যাবোই।"


" উফফ! সোনা। বিয়ের পর লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছ নাকি? তুমি থেকে একেবারে তুই? ছিঃ লোকে কি বলবে? নাহ সোনা। আজ থেকে মুখে তুই আনলেই ওই ঠোঁট ছু*রি দিয়ে কে'টে দেবো।''


তুশির কষ্টে কান্না পায়।  এই লোকটা কি তার মন বুঝবে না? একটা সহজ কথা বললে তার মিনিং আরোও জটিল করে দশটাতে নিয়ে যায়। তুশি শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঠুকে দেয়ালে। জীবনে সবচেয়ে বড় পা*পের শাস্তি কাজিনকে বিয়ে করা। নয়তো কি সবসময় খাপছাড়া কথার মাঝে লজ্জায় ম*রতে হয়?


তুষার বিভোর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ায় পাক্কা ৫০ মিনিটেও বেশী সময় বৃষ্টিতে ভিজলো তুশি। মন ভরে ভিজে পা টিপে টিপে রুমে এসেই দেখে আগের মতোই উদাম গায়ে ঘুমাচ্ছে তুষার। মনে মনে ফিক করে হেঁসেই বলে উঠে তুশি,


" তুশিকে আটকানো এতোই সহজ? হুহ। তোমার মতো বন মানুষের বৃষ্টির পানি সহ্য হয়না। ভীতুর ডিম কোথাকার। "


চট করেই ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসে। তখন প্রায় সন্ধ্যা নামার আগ মুহুর্ত। চারপাশ লাল আভায় পরিপূর্ণ। বিশাল আকাশের মাঝে কালো মেঘ জমে আছে। তুশি কিচেনের দিকে যেতেই চোখে পড়ে নূরজাহানকে। তিনি মাত্রই ঘুম থেকে উঠে চা বানাতেই রান্নাঘরে এসেছে। তুশি তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,


" মা আমার জন্যও এক কাপ চা বানাও।"


নূরজাহান তুশিকে আগাগোড়া নিক্ষেপ করে উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে,

" তুই বৃষ্টিতে ভিজেছিস? জ্বর আসলে কি উপায়?"


ধরা পড়ে যাওয়ায় দাঁত কেলিয়ে বলল,

" কই নাতো। কি যে আবোলতাবোল বকো সারাক্ষণ। "


" কানের নিচে থা*প্পড় পড়লেই সব সত্যি বেরিয়ে যাবে।"


তুশি মুখ ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে জবাব দেয়,

" তোমার খাটা'শ ছেলে কেনো সকালে ভিজতে দিলো না? তাহলেই তো এখন ভিজতাম না।"


" তুষার কোথায়? দেখেনি তোকে?"


নূরজাহান এক কাপ চা তুশির হাতে দিয়ে কথাটি বলে। তুশি হেঁসে  ধুঁয়া উঠা গরম চায়ে তৃপ্তি নিয়ে চুমুক দিয়ে বলে,


" নাহ সে আপাতত ঘুমে। কখনো জানতেই পারবে না, আমি এতোক্ষণ কি কি করেছি। মা তুমিও ঘুমাও, আমি যাই।কেমন  হালকা শীত শীত লাগছে। "


কথা শেষে চা খেতে খেতে তুশি চলে যায় নিজের রুমে। নূরজাহান ঠোঁট উল্টে ধীর গলায় বিড় বিড় করে, 


" একবার জ্বর আসুক তখনই বুঝবি তুষার কেমন উন্মাদ। বধ্য পা-গল হয়ে কি কি করতে পারে। আমার তো এখনই ভয় হচ্ছে, শেষে কিনা রেগে কয়েকটা থা-প্পড় মে*রে না দেয়।"


তুশি রুমে এসে চায়ের কাপ টেবিলে রাখলো। আস্তেধীরে  চুপিচুপি আগের মতোই তুষারের পাশে গিয়ে পাতলা কম্বলের নিচে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ে। হুট করেই মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। অজান্তেই চোখ বুঁজে আসছে। নাক দিয়েও হালকা পানি বের হচ্ছে। মিনিট দুয়েক পরেই তুশি সারা শরীর ঠান্ডা অনুভব করে।প্রচন্ড শীতে হাত পা হয়ে আসছে সাপের মতোই শীতল। তুষারের গা উষ্ণতায় ভরপুর। তাই একটু উমের খুঁজে তুষারের দিক ঘুরে কোলবালিশের ন্যায় জরিয়ে ধরে তাকে। নিজের ঠান্ডা পা দুটো তুষারের পায়ে চেপে ধরে। তৎক্ষনাৎ তুষারের ঘুম হালকা হয়ে যায়। চোখ মেলে দেখতে পায়, তুশি শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। সারা গা বরফের ন্যায় ঠান্ডা। হুট করেই বৃষ্টিতে ভেজার ফলে এমন হয়েছে। তুষার দু-হাতে জরিয়ে ধরে বুকে টেনে নিলো তুশিকে। চুলে হাত দিতেই রেগে যায় তুষার,


" বেয়াদব ঘুম বাদে এতোক্ষণ কি করছিলি তুই? আমি বার বার বলেছি বৃষ্টিতে ভিজবি না তবুও কেনো গেলি? অসভ্য, ইচ্ছে করছে ধাক্কা মে*রে বিছানা থেকে ফেলে দেই।"


তুশি আরোও শক্ত করে জরিয়ে ধরে তুষারের বুকে অবরত নাক ঘষতে থাকে। ধরে যাওয়া গলায় বলে,


" বেশ করেছি ভিজেছি। আরোও ভিজবো।তাতে তোমার কি? জ্বর আসবে ওষুধ খেয়ে বিছানায় পড়ে থাকবো।"


বু'কে তুশির ঠোঁটের স্পর্শ একটু একটু করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় তুষারকে। এভাবে পাশে বউ, তার মধ্যে রোমাঞ্চকর এক শীতল পরিবেশ। এ যেনো,নিজেকে মুহুর্তেই এলোমেলো করতে প্রস্তুত। তবুও তুষার ডান হাত তুশির চুলের ভাজে গলিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,


" আজকে ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু আর কোনোদিন আমার কথার অবাধ্য হলে হাড়ে হাড়ে টের পাবি তুষার কি জিনিস। "


" এখনো বুঝার বাকি আছে?"


" তবে বলছিস আমাকে পুরোপুরি পড়ে ফেলেছিস? "


" হুহ জংলী ভুত। "


তুশি চোখ বুঝে ছোট ছোট চু'মু খায় তুষারের লোশম বুকে। জাপ্টে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে যেতেই তুষার ওর কানে মৃদুভাবে কামড় খায়। কানের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,


" এভাবে আর কখনো বৃষ্টিতে ভিজবি না। "


" তবে কিসে ভিজবো?"


তুষার দুষ্টু হেঁসে জবাব দেয়, 

" তুই চাইলে এই সুইট মোমেন্টে আমার ভালোবাসায় ভিজে একাকার হতে পারিস। আজ থেকে সকাল-সন্ধ্যা যখনই ভিজতে ইচ্ছে করবে আমাকে শুধু একবার বলিস, দেখিস ইচ্ছে মতো ভিজিয়ে দেবো তোকে। "


তুশি লজ্জায় গুটিয়ে যায় আরোও। তুষারের ঠোঁট কা*টায় কথায় মুহুর্তেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কামড় বসায় ওর বুকে। ব্যথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে তুষার ঠোঁট কামড়ে পূর্নরায় ফিসফিসিয়ে বলে, 


" কামড় দিচ্ছিস কেনো? ভিজবি নাকি এখন? আয় তবে ভিজিয়ে দেই। আমার বিন্দু মাত্রও আপত্তি নেই। হয়তো সারাদেহ বৃষ্টির মতো ছুঁইয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু বাচ্চার মা ঠিকই বানাতে পারবো।"


চলবে..